জোয়ার ভাটা কি? কিরূপে ইহাদের সৃষ্টি হয়? বা, প্রাকৃতিক নিয়মে সমুদ্রের জল স্ফীত হওয়ার নাম জোয়ার (Flow or High tide) এবং এই স্ফীতজলের পতনকে বলা হয় ভাটা (Ebb or low tide)।
প্রধানতঃ চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণেই জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হইয়া থাকে। তবে এই জোয়ার-ভাটার মূলে চন্দ্রের আকর্ষণই প্রবল। সৌরজগতের সূর্য এবং গ্রহ ও উপগ্রহগুলি একে অপরকে অনবরত আকর্ষণ করিতেছে। সূর্য বৃহত্তর বলিয়া ইহার আকর্ষণই জোয়ার-ভাটা সংগঠনে প্রধান কারণ হওয়ার কথা। কিন্তু সূর্য বড় হইলেও (চন্দ্র হইতে ২৬০ লক্ষ গুর্ণ ভারী) চন্দ্র পৃথিবীর নিকটে থাকার জন্য পৃথিবীর উপর চন্দ্রের আকর্ষণ সূর্যের আকর্ষণের প্রায় দ্বিগুণ। আবার 'পৃথিবী আপন মেরুরেখার চারিদিকে ঘুরিতেছে বলিয়া জলরাশির উপর বিকর্ষণ-শক্তির প্রভাবে সমুদ্রের জলরাশি অবিরতই বাহিরের দিকে ছড়াইয়া পড়িতে চাহে। ইহাতে জোয়ার সৃষ্টির সাহায্য হয়ে থাকে।
চন্দ্রের আকর্ষণ পৃথিবীর স্থল ও জল উভয়ের উপর পড়ে। তবে স্থলভাগের উপর ইহার আকর্ষণ তত কার্যকরী হয় না। জল তরল পদার্থ বলিয়া জল-ভাগের উপর আকর্ষণই অধিক কার্যকরী হইয়া থাকে। আবর্তনের ফলে পৃথিবীর যে অংশ চন্দ্রের সম্মুখীন হয় সেই অংশেই 'চন্দ্রের আকর্ষণ অধিক পড়ে এবং সেই অংশের চারিদিকের জল আকর্ষণ-কেন্দ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। এই জোয়ারকে বলা হয় মুখ্য (Primary) বা প্রত্যক্ষ (Direct) অথবা নিকটবর্তী (near side) জোয়ার। প্রত্যক্ষ জোয়ারের ঠিক বিপরীতদিকে অর্থাৎ প্রতিপাদস্থানে মহাকর্ষ-শক্তির (gravitation) প্রভাব খুব কম।
সুতরাং ঐ অঞ্চলে বিকর্ষণশক্তি প্রভাবে জলস্ফীতি হইয়া থাকে। তখন ঐ পূর্ণিমার জোয়ার (ভরা কটাল বা তেজ কটাল) অঞ্চলে পরোক্ষ (indirect), গৌণ (secondary) বা দূরবর্তী (far side) জোয়ার' সংঘটিত হয়। অমাবস্যার জোয়ার (ভরা কটাল বা তেজ কটাল)
মুখ্য জোয়ার ও গৌণ জোয়ারের দিকে ঐ দুই স্থানের মধ্যবর্তী অঞ্চল হইতে জলরাশি প্রবাহিত হইতে থাকে। সুতরাং তখন ঐ মধ্যবর্তী অঞ্চল হইতে জল নামিতে থাকে । এইরূপভাবে জলের পতনকে বলা হয় ভাটা।
কোন স্থানে মুখ্য জোয়ার ঘটিবার ঠিক ১২ ঘণ্টা পর ঐ স্থানের প্রতিপাদস্থান চন্দ্রের সম্মুখীন হয়। সুতরাং পূর্বে যেখানে গৌণ জোয়ার ছিল সেখানে হইবে মুখ্য জোয়ার। এইজন্যই-প্রত্যেক স্থানেই দিনে দুইবার জোয়ার হইয়া থাকে এবং দুইবার ভাটা হইয়া থাকে। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারকে ভরা কটাল (Spring tide) এবং অষ্টমীর জোয়ারকে মরা কটাল (Neap tide) বলে।
